পেকুয়া প্রতিনিধি:
কক্সবাজারের পেকুয়ায় সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ মজুদ বা প্রদর্শন, ফিজিশিয়ান স্যাম্পল বিক্রির উদ্দেশ্যে সংরক্ষণ এবং নিবন্ধিত চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রির অভিযোগে চারটি ফার্মেসিকে জরিমানা করেছে উপজেলা প্রশাসন ও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ অভিযানে চারটি ফার্মেসিকে মোট ২৮ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
তবে অভিযানের পর অভিযোগ উঠেছে, অভিযানের আওতাধীন এলাকায় আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও সেগুলো যথাযথভাবে পরিদর্শন করা হয়নি। এর মধ্যে পেকুয়া ফোরকান হাসপাতাল ও ফার্মেসিতে অভিযান না চালিয়ে ঔষধ প্রশাসনের কর্মকর্তারা সেখানে আয়োজিত একটি আপ্যায়নে অংশ নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় স্থানীয় পর্যায়ে অভিযানের নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা ও কর্মকর্তাদের সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে ঔষধ প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা আপ্যায়নে অংশ নেওয়ার বিষয়টি সরাসরি স্বীকার বা অস্বীকার করেননি। তিনি দাবি করেছেন, সেখানে মিটিং করার জন্য গিয়েছিলেন।
উপজেলা প্রশাসন ও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার বিকেলে পেকুয়ার চৌমুহনী এলাকায় ভ্রাম্যমাণ অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে ঔষধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩-এর ৪০(খ), (গ) ও (ঘ) ধারায় চারটি ওষুধের দোকানকে মোট ২৮ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
অভিযানের সময় নিষিদ্ধ বা মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রির উদ্দেশ্যে মজুদ বা প্রদর্শন, ফিজিশিয়ান স্যাম্পল বিক্রির উদ্দেশ্যে সংরক্ষণ এবং নিবন্ধিত চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রির মতো বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
ওষুধের দোকানে এসব অনিয়ম জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় নিয়মিত তদারকি ও আইন প্রয়োগের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযান চলাকালে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ আনিসুল ইসলামকে অভিযান শেষ হয়েছে বলে বিদায় দেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। এরপর কক্সবাজার ঔষধ প্রশাসনের ঔষধ তত্ত্বাবধায়ক (ভারপ্রাপ্ত) কাজী মোহাম্মদ ফরহাদসহ তাঁর সঙ্গে থাকা কর্মকর্তারা পেকুয়া ফোরকান হাসপাতাল ও ফার্মেসি এলাকায় যান।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে আগে থেকেই বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরেও আনা হয়েছিল। ফলে যৌথ অভিযানের সময় প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন বা অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হবে—এমন প্রত্যাশা ছিল স্থানীয়দের।
কিন্তু সেখানে গিয়ে অভিযান পরিচালনার পরিবর্তে কর্মকর্তারা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে আয়োজিত আপ্যায়নে অংশ নেন—এমন অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কয়েকজন।
ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয় সাংবাদিকরা জানতে চাইলে কর্মকর্তাদের মধ্যে তৎপরতা দেখা যায় এবং তাঁরা দ্রুত সেখান থেকে চলে যান বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি।
অভিযান শেষে ফোরকান হাসপাতাল ও ফার্মেসিতে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে কক্সবাজার ঔষধ প্রশাসনের ঔষধ তত্ত্বাবধায়ক (ভারপ্রাপ্ত) কাজী মোহাম্মদ ফরহাদ বলেন, তাঁরা চৌমুহনীতে অভিযান করেছেন এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বসে মিটিং করার জন্য সেখানে গিয়েছিলেন।
কেন উপজেলা হলরুমে মিটিং না করে ওই প্রতিষ্ঠানে মিটিং করতে হলো—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘পাঁচজন নিয়ে উপজেলা হলরুমে মিটিং করা যায় না। তাই এখানে মিটিং করতে আসছি।’
তবে ফোরকান হাসপাতাল ও ফার্মেসিতে কর্মকর্তাদের আপ্যায়নে অংশ নেওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে তিনি কোনো স্পষ্ট বক্তব্য দেননি।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, কোনো নির্দিষ্ট ফার্মেসি বা হাসপাতালের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ থাকলে সেটি যাচাই করা সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের দায়িত্বের অংশ। বিশেষ করে একটি যৌথ ভ্রাম্যমাণ অভিযানের সময় অভিযোগের আওতাধীন প্রতিষ্ঠান কাছাকাছি থাকলে সেটি পরিদর্শন করা হলো না কেন—এ প্রশ্নের উত্তর চান তাঁরা।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের মতে, একটি অভিযানে কিছু প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়েছে, অথচ অভিযোগ থাকা অন্য প্রতিষ্ঠানে গিয়ে কর্মকর্তাদের আপ্যায়নে অংশ নেওয়ার অভিযোগ উঠলে স্বাভাবিকভাবেই অভিযানের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।
তাঁদের মতে, আপ্যায়নটি যদি নিছক সৌজন্য সাক্ষাৎ বা মিটিংও হয়ে থাকে, তবুও একজন নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মকর্তা যে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, সেই প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে আয়োজিত খাবার গ্রহণ করেছেন কি না—বিষয়টি পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
সরকারি দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সুবিধা, উপহার বা আতিথেয়তা গ্রহণের বিষয়টি আচরণবিধির আওতাধীন। সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর বিধি ৫-এ এমন উপহার গ্রহণের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধের কথা বলা হয়েছে, যার ফলে কোনো সরকারি কর্মচারী উপহারদাতার প্রতি সরকারি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে দায়বদ্ধতার অবস্থায় পড়তে পারেন।
এ কারণে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কোনো কর্মকর্তা তাঁর দায়িত্বের আওতাধীন কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে বিশেষ আপ্যায়ন গ্রহণ করলে সেটি সরকারি দায়িত্বের নিরপেক্ষতা বা স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন তৈরি করছে কি না—তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাইয়ের বিষয় বলে মনে করছেন আইন ও প্রশাসনসংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, পেকুয়া ফোরকান হাসপাতাল ও ফার্মেসির বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের মধ্যে ওষুধ বিক্রি, চিকিৎসাসেবা ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
স্থানীয়দের বক্তব্য, অভিযোগ সত্য হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে, আর অভিযোগ মিথ্যা হলে সেটিও তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার করা প্রয়োজন। কিন্তু কোনো অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত না হওয়াই সবচেয়ে বেশি প্রশ্নের জন্ম দেয়।
অভিযানে চারটি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করার বিষয়টি স্বাগত জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা। তবে তাঁদের প্রশ্ন—যদি অভিযানের উদ্দেশ্য হয় অনিয়মের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ, তাহলে অভিযানের আওতাধীন এলাকায় থাকা অন্যান্য অভিযোগযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোও কি একইভাবে যাচাই করা হয়েছিল?
তাঁদের মতে, শুধু কয়েকটি দোকানে অভিযান পরিচালনা করে জরিমানা আদায় করলেই বাজারের ওষুধ বিক্রির সামগ্রিক পরিস্থিতি নিশ্চিত করা যায় না। নিয়মিত পরিদর্শন, নমুনা পরীক্ষা, লাইসেন্স যাচাই, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ শনাক্তকরণ এবং ব্যবস্থাপত্র ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি বন্ধে ধারাবাহিক নজরদারি প্রয়োজন।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা বলেন, ওষুধ সাধারণ কোনো পণ্য নয়। নিম্নমানের, মেয়াদোত্তীর্ণ বা অননুমোদিত ওষুধ মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যের জন্য সরাসরি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। একইভাবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি ও ব্যবহার অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের মতো বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
তাই ওষুধ প্রশাসনের অভিযানে কোনো ধরনের পক্ষপাত, প্রভাব বা স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ ওঠা উচিত নয়। অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত বিষয়টি যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা জনসমক্ষে পরিষ্কার করা।
স্থানীয় সাংবাদিক ও সচেতন নাগরিকদের কয়েকজন বলছেন, পুরো ঘটনার একটি নিরপেক্ষ প্রশাসনিক যাচাই প্রয়োজন। বিশেষ করে অভিযানে কোন কোন প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করা হয়েছে, কোন কোন প্রতিষ্ঠানকে কেন পরিদর্শন করা হয়নি, ফোরকান হাসপাতাল ও ফার্মেসিতে কর্মকর্তারা কী উদ্দেশ্যে গিয়েছিলেন, সেখানে কোনো মিটিং হয়েছিল কি না এবং আপ্যায়নের ঘটনা ঘটেছিল কি না—এসব বিষয় তদন্তে পরিষ্কার হওয়া দরকার।
একই সঙ্গে অভিযানের সময় প্রস্তুত করা পরিদর্শন প্রতিবেদন, জরিমানার রসিদ, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পূর্বের অভিযোগ এবং অভিযানের সরকারি কার্যবিবরণী পর্যালোচনা করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে বলে মনে করছেন তাঁরা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, অভিযান শুধু জরিমানা আদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সব অভিযোগযুক্ত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ হতে হবে। একই সঙ্গে অভিযানে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের আচরণ নিয়েও যদি প্রশ্ন ওঠে, তারও নিরপেক্ষ ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
ওষুধের মতো জনস্বাস্থ্য-সংশ্লিষ্ট খাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অভিযান কতটা স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক—পেকুয়ার সাম্প্রতিক এই ঘটনাকে ঘিরে এখন সেই প্রশ্নই সামনে এসেছে।
